শীর্ষ সংবাদঃ

» উদ্ভুত করোনা পরিস্থিতি: সাধারণ কিছু কথা

প্রকাশিত: 28. March. 2020 | Saturday

উদ্ভুত করোনা পরিস্থিতি: সাধারণ কিছু কথা

ডাঃ ফারুকুজ্জামান

বর্তমান উপাত্ত অনুযায়ী, আমাদের দেশও অন্য দেশসমূহের মতো করোনা আক্রান্ত । তথ্যমতে, এখনো পর্যন্ত সর্বমোট ৪৮ জন আক্রান্ত, ৫ জন মৃত্যবরণ করেছেন। আমি। মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সহকর্মীদের মতো এই বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান রাখি না। আজ শুধুমাত্র জানবো সাধারণ কিছু তথ্য ও করণীয় বিষয় নিয়ে।

সাধারণ তথ্যাবলী:
১) রিপোর্ট ও তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, করোনা ভাইরাসের একটি প্রজাতি। অধিকাংশ ভাইরাসই তার জিনগত বা কাঠামোগত পরিবর্তন সাধন করে, নতুন রূপ নিতে সক্ষম। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের সম্পূর্ণ নতুন কিছু ধরণ মানবদেহে রোগ সংক্রমণ করছে (COVID-19), যা বিশ্বব্যাপী মহামারী রূপ ধারণ করেছে। কারণ, করোনা ভাইরাসের এই রোগটি একটি সংক্রমণ ব্যাধি। সোজা কথায় বললে, অত্যন্ত ছোঁয়াচে (কাঁশি, স্পর্শ ইত্যাদি সব মাধ্যমেই সংক্রমিত হতে পারে)।

২) করোনা ভাইরাসের এই ধরণটি সম্পূর্ণ নতুন বিধায়, এখনো পর্যন্ত আমাদের হাতে কার্যকরী সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নেই। আরো একটা দুরূহ কাজ হলো, করোনা রোগকে সাধারণ জ্বর, কাশি-সর্দি বা ফ্লু থেকে আলাদা করা, যা নিশ্চিতকরণের ডায়াগনোস্টিক কীট এখনো পর্যন্ত ততটা প্রতুল নয়। আক্রান্ত রোগীর উপসর্গের চিকিৎসা করা এবং রোগের সংক্রমণ প্রতিহত করাই এখন আমাদের একমাত্র অস্ত্র।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ সমূহ:
১) উল্লেখিত কারণে “কোনো হাসপাতালই এখন আর রোগী, চিকিৎসক কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য নিরাপদ স্থান নয়।” অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালই যে কারণে তাদের সেবার পরিধি গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। সাধারণ সেবা, ইমার্জেন্সি সেবা, এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাও বেঁধে ফেলতে হয়েছে সীমিত পরিসরের ছকে। লক্ষ্য একটাই, সংক্রমণ প্রতিহত করা। কারণ, সংক্রমণ ব্যাপকহারে একবার শুরু হলে, তখন তা প্রতিহত করা অত্যান্ত দুরূহ কাজ। ব্যাপকহারে প্রাণহানির সম্ভবনাও প্রকট।

২) এ ধরণের সংকট সরকার কিংবা চিকিৎসক কারো একার পক্ষে কাটিয়ে ওঠা সম্ভবপর নয়। আমি-আপনি যদি সচেতন না হই, সহযোগিতা না করি, এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আদৌ সম্ভব নয়। নির্দেশনার প্রতি আমরা যদি শ্রদ্ধাশীল না হই, সরকার প্রদত্ত ছুটি কিংবা ইত্যাদি সুবিধাবলীকে হালকাভাবে দেখি, তাহলে এর চরম মূল্য আমাদেরকেই দিতে হতে পা‌রে আগামী দিনগুলোতে।

৩) বিভিন্ন প্রতিবেদন ও মিডিয়াতে, পুন: পুন: বিভিন্ন পর্যায়ে নানা বিষয়ে সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা, সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। শুরু হয়েছে কাদা ছোড়াছুড়ি। এসব সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে, সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব না হলে, ফলপ্রসূ প্রাপ্তি সম্ভব নয়। আসুন না সকলে মিলে একবার চেষ্টা করে দেখি, যে যার অবস্থান থেকে। এ যুদ্ধে জেতা যায় কিনা? কে জানে, হয়তো আমরাই পারবো, আমাদের কাজ দিয়ে এ যুদ্ধ সহনীয় পর্যায়ে থামিয়ে দিতে। যা অনেক সভ্য দেশেও সম্ভন হয়নি কিংবা আদৌ সম্ভবপর ছিল না।

করণীয় কি?
“প্রতিরোধে করণীয় কি?”- এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে, এমনকি আমাদের বিশেষজ্ঞ সহকর্মীরাও ইতিমধ্যে বিভিন্নভাবে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যারা এ বিষয়ে আমার থেকে অনেক বেশি অভিজ্ঞ। তাই আমার এই লেখায় এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু বললাম না। শুধু অনুরোধ রাখছি সেগুলো মেনে চলার।
“এটা মোটেই জরুরি নয় যে, সবাইকে সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধে শামিল হতে হবে। জরুরি হলো, আপনার সচেতনতা-সহযোগিতা, যে যার কাতার থেকে, যে যার পর্যায় থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় মানসিকতা।” আপনার দেওয়া হাতিয়ার, সহযোগিতা, সামান্য উৎসাহই হয়তো, সামনের সারিতে অতি কষ্ট করে লড়াই চালিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য, এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তা না হলে যতই নিয়মের বেড়াজালে বাধার চেষ্টা করা হোক না কেন, এই মানুষগুলোই এক সময় অসহায় বোধ করবে, দিশেহারা গন্তব্যে ছুটবে।

আরেকটা কথা না বললেই নয়, করোনাকে যদি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে যথাসময়ে বেঁধে ফেলা না যায়, আমি জানি না, কতজন এদেশে এ রোগে মৃত্যুবরণ করবে? তার থেকে বেশি মানুষের জীবন যাবে, করোনা পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্যতায়, অর্ধাহারে, অনাহারে। আর এরা না বাঁচলে, বাচঁবে না দেশের অর্থনীতি, কোনঠাসা হয়ে পড়বে দেশ। তাই দেশের আগামী দিনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান করোনা পরিস্থিতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত, আমরা যেন সামর্থ্য অনুযায়ী এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারি, যা এই পরিস্থিতিতে আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।

আমরা নিজেরা সচেতন হলে, আমাদের রাস্তায় সেনাবাহিনীর প্রয়োজন পড়বে না । এ যুদ্ধ দেশের সেনাবাহিনীর নয়। এ যুদ্ধটা আপনার-আমার সকলের। ইন-শা-আল্লাহ আমরা জয়ী হবো। আল্লাহ্পাক আমাদের সহায় হোন।।

ডাঃ ফারুকুজ্জামান
এফ সি পি এস (সার্জারি), এম এস ( সার্জারি ),
এম আর সি এস (ইংল্যান্ড), এম সি পি এস (সার্জারি)
সহকারী রেজিস্ট্রার, সার্জারি বিভাগ
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২৪৫ বার

error: Content is protected !!