শীর্ষ সংবাদঃ

» বৃহদান্তের (কোলন) ক্যান্সার নিয়ে কিছু কথা – ডাঃ ফারুকুজ্জামান

প্রকাশিত: 09. January. 2021 | Saturday

বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বৃহদান্তের (কোলন) ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন l হাজারো মানুষের হৃদয় জয় করা এই প্রখ্যাত সাহিত্যিক হেরে যান ক্যান্সারের কাছে l আজ আমরা জানবো, বৃহদান্তের ক্যান্সার নিয়ে l বিশ্বব্যাপী মরণঘাতী ক্যান্সারের অন্যতম বৃহদান্তের ক্যান্সার l পরিসংখ্যান বলছে, মৃত্যুহারের দিক দিয়ে বৃহদান্তের ক্যান্সারের অবস্থান পঞ্চম l প্রতি ২৩ জনে একজন তাদের জীবদ্দশায় বৃহদান্তের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন l প্রতিবছর শুধুমাত্র আমেরিকাতেই প্রায় দেড় লক্ষ নতুন রোগী সনাক্ত হয় l আমাদের দেশে সঠিক কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান হাতে না থাকলেও, বাস্তব প্রেক্ষাপট যে কতটা ভয়াবহ তা সহজেই অনুমেয় l

বৃহদান্তের (কোলন) ক্যান্সার:
বৃহদান্তের ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ, যদি তা শুধুমাত্র প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায় l অন্যথায় পরিনাম ভয়াবহ l কিন্তু বাস্তবতা হলো, বৃহদান্তের ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করা খুব শক্ত বিষয় l যার সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত কিছু কারণও আছে:

১) বৃহদান্তের ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণভাবে উপসর্গহীন l কোনো কোনো ক্ষেত্রে, এ পর্যায়ে যে সব উপসর্গ প্রকাশিত হয় তা ও অস্পষ্ট (বৃহদান্তের অন্য রোগের উপসর্গ থেকে আলাদা করা যায় না) l

২) বৃহদান্তের ক্যান্সার নিশ্চিতভাবে সনাক্তকরণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হলো Colonoscopy (কোলোনোস্কোপির মাধ্যমে বৃহদান্তের ভিতরের অংশ পরীক্ষা করে সেখান থেকে মাংস নিয়ে তা পরীক্ষার জন্য পাঠানো) l বাস্তবতা হলো, অস্বস্তির কারণে অনেক রোগীই সময়মতো পরীক্ষাটি করতে অনীহা প্রকাশ করেন l

বৃহদান্তের ক্যান্সারের পর্যায়সমূহ:
সাধারণভাবে বৃহদান্তের ক্যান্সারের পর্যায় চারটি l প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়কেই সামগ্রিকভাবে প্রাথমিক পর্যায় বলা হয় l এ পর্যায়ে বৃহদান্তের ক্যান্সার সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা সম্ভব l কিন্তু সমস্যা হলো এই পর্যায়ে রোগীটি ধরা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা l মনে রাখা প্রয়োজন, অপেরেশনই কোলন ক্যান্সারের একমাত্র নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা l চতুর্থ পর্যায়ে এই রোগ আর নিরাময়যোগ্য থাকে না l

কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষত তৃতীয় পর্যায়ে অপেরেশনের আগেই রোগীকে কেমোথেরাপি নিতে হতে পারে l আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন যে, অপেরেশনের পর পর্যায় অনুযায়ী রোগীকে কেমোথেরাপি নেয়ার প্রয়োজন পড়ে l আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, কোনো কোনো রোগী অপারেশনের পর পরই এই ধারণা পোষণ করে যে, তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে l এজন্য তারা কেমোথেরাপি নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না l কিংবা শুরু করলেও তা বন্ধ করে দেয় l এর আরো কিছু বাস্তব সঙ্গত কারণ আছে l যেমন: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেমোথেরাপি ব্যায়বহুল, যা বহন করার ক্ষমতা অনেক দরিদ্র রোগীরই নেই l তাছাড়াও কেমোথেরাপির সাইড ইফেক্ট হিসাবে বিভিন্ন উপসর্গ দেখতে পাওয়া যায় (শরীর খারাপ লাগে, বমি হয়, পাতলা পায়খানা হতে পারে, চুল পড়ে যায় ইত্যাদি) l এসব জটিলতার কারণে অনেক রোগীই কেমোথেরাপি শুরু করলেও তা বন্ধ করে দেয় l ফলাফল ক্যান্সারে পুনরাবৃত্তি (Recurrence) l

চিকিৎসা:
প্রাথমিক পর্যায়ে অপেরেশনের মাধ্যমে বৃহদান্তের ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য l অপারেশন পরবর্তী সময়ে কেমোথেরাপি নেয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে l পরবর্তী পর্যায়ে রোগ বৃহদান্তের বাইরে যকৃৎ (Liver)-সহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে (যেমন: ফুসফুস, মস্তিস্ক, হাড়) ছড়িয়ে পড়ায় রোগটি আর আরোগ্যের পর্যায়ে থাকে না l নিশ্চিত মৃত্যু পথযাত্রী রোগীর উপসর্গের চিকিৎসা করাই তখন মুখ্য লক্ষ্য l কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপসর্গ কমাতে কেমোথেরাপি দেয়া হয় l ক্ষেত্র বিশেষে রোগীর উপসর্গ কমাতে অপারেশন করা হয় l তবে এতে রোগীর রোগের কোনো উন্নতি হয় না, শুধুমাত্র সাময়িকভাবে উপসর্গ কমে l

ডাঃ ফারুকুজ্জামান
FCPS, MS, MRCS, MCPS,
কনসালটেন্ট (সার্জারি বিভাগ),
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৯৫ বার

error: Content is protected !!