শীর্ষ সংবাদঃ

» ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ বটতলা

প্রকাশিত: 11. July. 2021 | Sunday

এস,এম,হারুনার রাশিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ১০০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে পদার্পণ কালে বারবার স্মৃতিতে ভেসে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী। আমরা যে স্বাধীনতার আগে ও পরের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সাক্ষী।কি করে ভূলি এসব ঘটনা।মনে হয় এই সেদিন, সম্ভবত ২২ February ,১৯৬৯ সকাল ১১.০০- ১২.০০ টার দিকে হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় বিনা ঘোষনায় বঙ্গবন্ধুর আগমনে আমরা উপস্থিত ছাত্ররা একেবারে স্থম্ভিত এবং উল্লসিত।তখন বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রনেতা তৎকালীন জিন্নাহ হল( বর্তমান সূর্যসেন হল) এর ফজলু ভাই, তাজুল ইসলাম হাসমী ভাই , ইকবাল সোবহান চৌধুরী ভাই এবং আর একজন বড় ভাই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল এবং জননেতা শেখ মুজিব এর মুক্তির জন্য বটলায় আমরণ অনশন ধর্মঘট পালন করছিলেন।চারজনেরই গলায় ছিল ফুলের মালা।

আমরা বিশেষকরে সূর্যসেন হলের কিছু ছাত্র অধিকাংশ সময়ে তাঁদের ঘিরে থাকতাম। বংগবন্ধু জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে তাঁদেরই অনশন ভাংগানোর জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন বটতলায়। এ খবর পেয়ে ধুতি পরা ও সাদা হাফহাতা সেন্ডো গেঞ্জি গায়ে ভূড়িওয়ালা মধু দা তাঁর ক্যান্টিনের বড় এক ঠোঙ্গা সিঙ্গাড়া হাতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে বললেন ”মুজিব ভাই আপনার জন্য গরম সিঙ্গাড়া নিয়ে এসেছি”। বঙ্গবন্ধু “মধু তোর কেমন চলছে ?” এ কথা বলে মধু দা কে জড়িয়ে ধরলেন। বঙ্গবন্ধু ঠোঙ্গা থেকে একটি সিঙ্গাড়া
নিয়ে মুখে দিয়ে বললেন” আহারে মধু তোর বানানো মজার সিঙ্গাড়া বহু বছর খাইনা”।তারপর পাশে দাঁড়ানো আমার হাতে ঠোঙ্গাটা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন” তুই একটা খা আর ওদের সবাইকে দে”। আমি একটা নিয়ে অনশনকারী বড়ভাইদের সহ অনেককে সিঙ্গাড়া বিতরণ করে দিলাম।এই ঐতিহাসিক ঘটনা কি কোন দিন মন থেকে মুছে যাবে? কোনদিনই না।

কি করে ভুলবো মিছিলে গিয়ে মর্নিং নিউজ পত্রিকা ও হামিদুর রহমানের বাসভবনে অগ্নি সংযোগের ঘটনা। আর ২০ জানুয়ারী ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে শহীদ আসাদকে গুলি করে হত্যার পর ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে স্মৃতি সে সময়ের সকল ছাত্র-ছাত্রী তাদের মনের গভীরে চির জীবন বয়ে বেড়াবে। যেদিন ১ম বারের মতো ভিসি স্যারের বাসভবনের সামনে রেজিষ্ট্রি বিল্ডিং সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে লাল পতাকা উড়িয়ে এসে ইপিআর বাহিনী তৎকালীন জিন্নাহ হল(বর্তমান সূর্যসেন হল) এর গেট ভেঙ্গে প্রবেশ করে ছাত্রনেতা আফম মাহবুবুল হক ভাই সহ উপস্থিত ছাত্র ও হলের কর্মচারীদের যে ভাবে বেধরক পিটিয়ে মারাত্বক ভাবে আহত করেছিলো সে ঘটনা কি করে ভূলবো
?ইপিআর এর আগমন বার্তা টের পেয়ে দ্রুততার সাথে গেট আটকানোর চেষ্টা কালে জয়নাল নামে যে দারোয়ানের হাতের একটি আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো সে দারোয়ানও ইপিআর বাহিনীর তান্ডব থেকে সেদিন রেহায় পায়নি।

এমনকি হলের ননবেঙ্গলি কেয়ারটেকার বয়স্ক ওয়াদুদ ভাইকে ও মারাত্বক ভাবে আহত করেছিল ইপিআর বাহিনী। ১৯৬৯ এর ১২ February সার্জেন্ট জহুরুল হকের হত্যার ঘটনার পর থেকে রাত্রের টিভি নিউজ শোনার জন্য টিভি রুম থেকে টিভি হলের মাঠে স্থাপনের সিস্টেম চালু করা হয়েছিল।ছাত্রনেতা আফম মাহবুবুল হক ভাই ও আফতাব আহমেদ ছিল এর মূল উদ্যোক্তা। ১৮ February ১৯৬৯ এর রাত্র বেলার নিউজ এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর জোহার হত্যার সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথেই কার্ফু ভেঙ্গে আমাদের হল সহ বিভিন্ন হল এমনকি মেয়েদের রোকেয়া হল থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের যে স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বের হয়েছিল তা কি আমরা যারা অংশগ্রণকারী ছিলাম তারা কি কোন দিন ভূলতে পারবো?

সেদিন রাতের কার্ফু ভেঙ্গে সমগ্র নীলক্ষেত এলাকা দখলে নেয়া ছাত্র-ছাত্রীদের একদিকে গগনবিদারী শ্লোগান এবং অপরদিকে পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর গুলির আওয়াজ আজও মনে শিহরণ জাগে। ভূলতে পারিনা সে সময়ের সৈনিক আমাদের সূর্যসেন হলের (বর্তমান) আফম মাহবুবুল হক ভাই(নোয়াখালী),আফতাব আহমেদ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান),শরীফ উল্লাহ ভূয়া(ইতিহাস),মোস্তাফা জব্বার(বাংলা),রেজাউল করিম( অর্থনীতি ),সাত্তার ভুঁইয়া (অর্থনীতি) মোহাম্মদ আলী (অর্থনীতি) ফজলু ভাই (এম বি এ) আফজাল ভাই (ফরিদপুর) শাহনেয়াজ(ইংরেজী) আকরাম (ছাত্র ইউনিয়ন) বোরহান (অর্থনীতি)সামসুদ্দিন আহমেদ (অর্থনীতি),আনসার (ইতিহাস),বদিউল আলম (বর্তমান সাংবাদিক) এবং আমার অতি ঘনিষ্ট পাঁচ তলার বন্ধু আব্দুর রউফ সরকার (বাংলা), সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (ইংরেজী), সরদার মঞ্জি (মনোবিজ্ঞান) বাপ্পি (অর্থনীতি) এবং হীরন (বানিজ্য) সহ আরো অনেককে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক সময়ে এদের মধ্যে আজ যারা আমাদের মাঝে নেই তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং অন্যান্য যারা যেখানেই থাকুক না কেন তাদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর পুরানো ঐতিহ্য ফিরে পাক এটাই মনে প্রাণে এ কামনা করি।

লেখকঃ এস,এম,হারুনার রাশিদ

যুগ্ম সচিব (অবঃ) ও সাবেক ডিসি

ইমেইল: rashidharun9191@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯৫ বার

error: Content is protected !!